ডেস্টিনি ও যুবকের পর এসপিসি, আরএসটি, এলটি, রিংআইডি, এমটিএফইঃ এমএলএম কোম্পানী বনাম পিরামিড/পঞ্জি স্কিম
অনলাইনে আর্থিক লেনদেন সহজ ও প্রযুক্তির ব্যবহারের প্রসারের কারণে প্রচুর অনলাইন বেটিং/জুয়া, ফরেক্স/ক্রিপ্টো ট্রেডিং ইত্যাদিসহ নানা ধরণের ব্যবসার উদ্ভব ঘটেছে। এগুলোর মধ্যে কিছু আছে পঞ্জি অথবা পিরামিড স্কিম। এই পোস্টে আলোচনা করা হয়েছে বহুল পরিচিত এসপিসি, আরএসটি, এলটি, রিংআইডি, এমটিএফই ইত্যাদির প্রকৃতি নিয়ে।
আমাদের দেশের এসপিসি, আরএসটি, এলটি, রিংআইডি ইত্যাদি মূলত পিরামিড স্কিম। অনেকে এগুলোকে মাল্টিলেভেল মার্কেটিং প্রতিষ্ঠান বলেন। বাংলাদেশে সম্প্রতি বহুল আলোচিত এমটিএফই হচ্ছে একটি পঞ্জি স্কিম।
পিরামিড স্কিম (Pyramid Schemes)
পিরামিড স্কিম হল একটা ব্যবসা কাঠামো (Business Model) যেখানে অংশগ্রহণকারী/সদস্যদেরকে নতুন সদস্য আনার /ভর্তি করার বিপরীতে অর্থ / সেবা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। অর্থাৎ এখানে যে আয় আসে তা আসে নতুন সদস্য আনার পুরস্কার হিসেবে, কোন বিনিয়োগ এর মুনাফা/রিটার্ন বা পণ্য/সেবা বিক্রয়ের কমিশন হিসেবে নয়। যতদিন নতুন সদস্যদের কাছ থেকে প্রাপ্ত অর্থ কমিশন হিসেবে বণ্টিত অর্থের চেয়ে বেশি হবে ততদিন এটা টিকে থাকবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অসৎ উদ্যোক্তারা আগেই বন্ধ করে দিয়ে সদস্যদের টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়। অথবা আইনশৃংখলা বাহিনীর তৎপরতা আঁচ করতে পেরে টাকা বিদেশে পাচার করে দেয় অথবা টাকা অন্য একাউন্টে ট্রান্সফার করে দেয় । নিজে গ্রেপ্তার হয়ে কিছুদিন পর আইনের ফাঁক-ফোঁকর দিয়ে ছাড়া পেয়ে যায়। কিন্তু সাধারন সদস্যদের টাকা ফেরত পাওয়া সম্ভব হয় না।
পঞ্জি স্কিম
পঞ্জি স্কিম হল এমন একটা বিনিয়োগ স্কিম যেখানে অতি দ্রুত উচ্চ মুনাফার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। বিনিয়োগকৃত অর্থ লাভজনক খাতে (যেমন শেয়ার, বৈদেশিক মুদ্রা, ফ্ল্যাট ইত্যাদি) বিনিয়োগ করা হয়ে থাকে। তবে এই বিনিয়োগের লাভের চেয়েও উচ্চ লাভের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। অর্থনীতি খারাপ হলেও লাভ বজায় রাখার মত অস্বাভাবিক প্রতিশ্রুতিও এই স্কিমের বৈশিষ্ট্য। এই লোভে প্রচুর বিনিয়োগ আসে। মূল বিনিয়োগ (আয় সৃষ্টিকারী) তখন গৌণ হয়ে যায় অথবা আদৌ থাকে না। নতুন বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে আসা বিনিয়োগ এর টাকা কমিশন হিসেবে ভাগ হয় যা মুনাফা রিটার্ন নাম দিয়ে গ্রাহকের হিসাবে যোগ করা হয়। এক সময় এটা বন্ধ হয়ে যায়। যতদিন নতুন বিনিয়োগ তুলে নেয়া টাকার (কমিশন/মুনাফা ও মূলধন) চেয়ে বেশি হয় ততদিন টিকে থাকে এই স্কিম।
যেমনঃ সম্প্রতি বাংলাদেশে বহুল আলোচিত দুবাই ভিত্তিক ইনভেস্টিং এপ্লিকেশন এমটিএফই একটা পঞ্জি স্কিম বলা যায়।
এগুলো কেন মাল্টিলেভেল মার্কেটিং প্রতিষ্ঠান নয়?
মাল্টিলেভেল মার্কেটিং এ এজেন্ট এর মাধ্যমে পণ্য বা সেবা বিপণন করা হয় এবং পণ্য বিক্রয় ও নতুন এজেন্ট আনার বিনিময়ে (আনীত এজেন্ট দের বিক্রীত পণ্যের উপর) কমিশন দেয়া হয়।
এগুলো কি ইকমার্স প্রতিষ্ঠান?
এসব স্কিম শুরুতে চালু করা হয় অন্য কোন ব্যবসায়ের নাম করে যেমন ইকমার্স প্রতিষ্ঠান হিসেবে রেজিস্ট্রেশন নিয়ে।এই ইকমার্স বা ট্রেডিং এর কথা বলে মানুষকে বিশ্বাস করানো হয়। এটা না বললে কেউ বিনিয়োগ করবে না। পরবর্তীতে এ ব্যবসাটি মূলত গৌণ হয়ে যায় এবং এর আড়ালে চলে পিরামিড স্কিম এর প্রসার।
যেমন আমরা ইভ্যালি র কথা জানি। অস্বাভাবিকভাবে কম মূল্যে পণ্য দেয়ার কথা বলে প্রচুর গ্রাহকের কাছ থেকে বড় অংকের টাকা অগ্রিম নিত। পণ্য দিত অল্প কিছু গ্রাহককে। যতদিন কমদামে পণ্যের লোভে অর্ডার (সাথে টাকাও) আসতে থাকবে এ টাকার অংশবিশেষ দিয়ে ধীরে ধীরে পণ্য সাপ্লাই দেয়া যাবে। ইভ্যালি কিন্তু এত কম দামে কিনেনি। তাহলে তাহলে তার লাভ কি? এই যে অল্পদামের কারণে বিপুল সংখ্যক অর্ডার আর বিপুল পরিমাণ টাকা, কিছু কিছু করে অর্ডার পূরণ করা, নানা অজুহাতে কিছু কিছু গ্রাহককে অপেক্ষায় রেখে বাকি টাকা কোথাও ইনভেস্ট করে লাভ করা (অথবা মালিকের নামে বাড়ি গাড়ি ফ্ল্যাট কেনা) । যতদিন নতুন অর্ডার আসবে ততদিন চলবে এই ব্যবসা।
শুধু ইকমার্স না এইটা ট্রেডিং, মানবসেবা ইত্যাদি অনেক কিছুর নামেই আসতে পারে। দিনশেষে এরা একই রকম ।
এটা কেন ফল করে?
এখানে কোন মূল্য সংযোজন নেই। যেকোন ব্যবসায়ে মূল্য সংযোজন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যা সম্ভব হয় পণ্য বা সেবা উৎপাদন ও বণ্টন প্রক্রিয়ায়। যেখানে কোন পণ্য , সেবা বা বিনিয়োগ নেই সেখানে কোন মূল্য সংযোজন নেই।
এসব স্কীমে হয় নতুন মেম্বার এর ভর্তি বা রেজিস্ট্রেশন ফি এর ভাগাভাগি। যতদিন নতুন মেম্বার আসতে থাকবে ততদিন উপরের লোকদের আয় হতে থাকবে অথবা প্রতিশ্রুত আয় আসতে থাকবে।
এটা আসলে কোন বৈধ ব্যবসা নয়। এখানে যেহেতু ব্যবসা বা মূল্য সংযোজন করে অর্থোপার্জন নেই তাই কোন দেশেই এটা বৈধ না। কিন্তু মানূষের অজ্ঞতা ও লোভের সুযোগ নিয়ে এটা গড়ে ওঠে ও প্রসার লাভ করে। কিন্তু পরবর্তীতে হয় আইনের হস্তক্ষেপের কারণে বন্ধ হয় । অথবা প্রবর্তকরা টাকা কুক্ষিগত করার উদ্দ্যেশ্যে এটা বন্ধ করে দিয়ে টাকা নিয়ে ভেগে যায় (মূলত তাদের উদ্দ্যেশ্য এটাই)।
এটার ভবিষ্যত ভাল না জেনেও কেউ কেউ কেন বিনিয়োগ করে বা টাকা নিয়ে বের হয়ে যায় না?
অনেকেই লোভের ও অজ্ঞতার কারণে এখানে টাকা দেয়। অনেকেই বন্ধুবান্ধবের উপর আস্থার কারণে রাজি হয়ে টাকা বিনিয়োগ করে। কেউ আবার মূল পেশার পাশাপাশি অতিরিক্ত আয়ের জন্য স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বিনিয়োগ করে থাকে।
আবার অনেকে নিজেকে চালাক ভাবে। মূলধন উঠে আসলেই বেরিয়ে যাব এই চিন্তা করে। কিন্তু যখন লাভ হওয়া শুরু হয় তখন আরো পাওয়ার লোভে থেকে যায়। জুয়া খেলা/ বেটিং যেরকম এটা সেরকম। কেউ বেটিং এ টাকা জিতলে মনে করে আরো খেলি। আরো বড় অংকের টাকা জেতা যাবে। এক সময় যা ছিল তাও হারিয়ে বসে।

Comments
Post a Comment