বই প্রসঙ্গেঃ অধ্যাপক মঈনুদ্দিন চৌধুরীর
“ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স”
আবেগ নিজে কোন খারাপ বা নেতিবাচক বস্তু
নয়। কখনো কখনো আবেগ তাড়িত হয়ে প্রতিক্রিয়া (React) না দেখিয়ে যুক্তি দিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত (Response) নিতে হয়।
কখনোবা আবার পরিবেশ – পারিপার্শ্বিকতা অনুযায়ি আবেগের প্রকাশকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়,
যার ফলে আবেগকে সৃজনশীল ও উৎপাদনশীলভাবে ব্যবহার করা যায়। নিজের ও অন্যদের আবেগকে বুঝে
প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়াই আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা বা ইআই (Emotional Intelligence - EI)। যেমন বইয়ের লেখক উদাহরণ এনেছেন, যে কেউ রাগ করতে পারে – এটা সহজ। তবে
সঠিক সময়ে সঠিক ব্যক্তির সাথে রাগ করা খুবই কঠিন । আবেগীয় বুদ্ধিমত্তার আধুনিক জনক
বলে খ্যাত ড্যানিয়েল গোলম্যানের মতে আবেগীয় বুদ্ধিমত্তার মোটা দাগে পাঁচটি অংশ রয়েছেঃ
১/ নিজের আবেগ ও অন্যদের উপর এর প্রভাবকে জানা ২/ নিজের আবেগের নিয়ন্ত্রণ ও যথাযথ বহিঃপ্রকাশ
৩/ অন্যের আবেগকে বোঝা ৪/ অন্যের আবেগকে সামলানো বা অন্যদের মনের অবস্থা বুঝে কাজ করা
৫/ নিজেকে এই প্রক্রিয়ায় উৎসাহিত রাখা ।
কার্যকর নেতৃত্বের অন্যতম পূর্বশর্ত হল
আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা । আবেগীয় বুদ্ধিমত্তাকে বুদ্ধাংক বা আইকিউ (Intelligence Quotient - IQ) এর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন আধুনিক মনোবিজ্ঞানীরা। গবেষণা বলছে,
সবচেয়ে বেশি বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা সাধারণ বা গড় বুদ্ধিমান ব্যক্তিদের চেয়ে ২০ শতাংশ
ক্ষেত্রে বেশি সফল হন। অন্যদিকে সাধারণ বা গড় বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ব্যক্তিরা সবচেয়ে
বেশি বুদ্ধিমান ব্যক্তিদের চেয়ে ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে বেশি সফল । এক্ষেত্রে মূল কারণ হিসেবে
ইআই কে অনুঘটক হিসেবে খুঁজে পাওয়ার দাবি করেছেন গবেষকরা। সফলতা অর্জনের ক্ষেত্রে আইকিউ এর পাশাপাশি ইআই ও
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আইকিউ যেখানে জন্মগত ও স্থির সেখানে ইআই শেখাও যায় বা চর্চা
করার মাধ্যমে উন্নত করা যায়।
অধ্যাপক মঈনুদ্দিন চৌধুরির লেখা ইমোশনাল
ইন্টেলিজেন্স নামক বাংলা বইটা পড়ে কয়েকটা দিক শণাক্ত করলাম। প্রথম অধ্যায়ে আলোচনা করা
হয়েছে আবেগীয় বুদ্ধিমত্তার প্রকৃতি, গুরুত্ব, ইতিহাস, পরিমাপ পদ্ধতি ইত্যাদি নিয়ে।
পরবর্তী পাঁচটি অদ্ধ্যায় মূলত উপরে বর্ণিত পাঁচটি অংশ বা উপাদান। লেখক এগুলোকে বর্ণনা
করেছেন যথাক্রমে আত্বসচেতনতা, আত্বব্যবস্থাপনা, সামাজিক সচেতনতা, সামাজিক দক্ষতা ও
আত্বঅনুপ্রেরণা হিসেবে।
বইটা আরো বেশি সুখপাঠ্য ও সহজপাঠ্য হতে
পারত এবং হওয়ার দরকার ছিল। এক্ষেত্রে বাধা
হয়ে দাঁড়িয়েছে এটা যে কিছু ইংরেজি শব্দ বা শব্দগুচ্ছের শুধুমাত্র বাংলা পারিভাষিক অর্থ
দেওয়া হয়েছে। সাথে সাথে এগুলোর সংজ্ঞা বা যে বিশেষ অর্থে এগুলো ব্যবহার হয় তা বিস্তারিতভাবে
উল্লেখ করা হয়নি। কোন কোন ক্ষেত্রে উল্লেখ করা হয়েছে তবে অন্য কোন অধ্যায়ে আলোচনার
প্রয়োজনে। ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স যেহেতু মনোবিজ্ঞান, স্নায়ুবিজ্ঞান, সামাজিক স্নায়ুবিজ্ঞানের
বিষয়বস্তু তাই বাংলা অর্থের সাথে সাথে পরিভাষিক বিভিন্ন শব্দ বা শব্দগুচ্ছের ব্যবহারিক
অর্থও উল্লেখ করলে ভাল হত। পাঠকের জন্য আরো সহজবোধ্য হত। যেমনঃ সামাজিক সচেতনতা অধ্যায়ে
ইংরেজি Empathy শব্দের বাংলা অর্থ দেয়া হয়েছে সহমর্মিতা কিন্তু এর সংজ্ঞা বা ব্যবহারিক
অর্থ তুলে ধরা হয় নি। সহমর্মিতা আসলে কি জিনিস, এটা দ্বারা কি বুঝানো হয়েছে , অথবা
এখানে কি অর্থে এটাকে ব্যবহার করা হয়েছে, এটা উল্লেখ থাকলে বিষয়বস্তু বুঝা আরো সহজ
হত। আরো অনেক উদাহরণ দেয়া যাবে। যেমনঃ ইংরেজি
Soft Skill এর বাংলা অর্থ করা হয়েছে কোমল দক্ষতা । কিন্তু এটা উল্লেখ করে এর অর্থ
দেয়া হয়েছে পরবর্তী অন্য কোন অধ্যায়ে (সামাজিক দক্ষতা ) দক্ষতার প্রকারভেদ আলোচনার
প্রসঙ্গে ।
কিছু কিছু জায়গায় আরো বেশি আলোচনার প্রয়োজন
ছিল। যেমনঃ সামাজিক সচেতনতা অধ্যায়ে ড্যানিয়েল গোলম্যানের ভাষায় সামজিক সচেতনতা অর্জনের
জন্য তিনটি বৈষিষ্ট্যের কথা বলা হয়েছে । সহমর্মিতা, সাংগঠনিক সচেতনতা, এবং সেবার মানসিকতা।
এই তিনটি বিষয়ে আরো আলোচনা না থাকায় ড্যানিয়েল গোলম্যানের এই উদ্ধৃতিটির অন্তর্ভুক্তি
আসলে অর্থহীন হয়ে গেছে। এরকম আরো কিছু জায়গায় কিছুটা বিস্তারিত আলোচনা হলে আরো ভাল
হত।
দ্বিতীয়ত, এ বইটিতে রেফারেন্সিং বা তথ্যসূত্র
প্রদান এর জন্য কোন আধুনিক স্টাইল বা পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় নি। করলে একদিকে যেমন বইটি
বৈজ্ঞানিক মানদন্ডে উন্নীত হত ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি পেত, তেমনি অন্যদিকে পাঠকের জন্য
এ সম্পর্কিত আরো লেখা/তথ্য খুঁজে পাওয়া সহজ হত ও বইটির পাঠকপ্রিয়তা বেড়ে যেত।
উপরোক্ত বিষয়গুলো বাদ দিলে বইটা পূর্ণাঙ্গ
ও যথেষ্ট উপকারীও বটে । লেখক যে এ বিষয়ে যথেষ্ট বিশেষজ্ঞ তার ছাপ এ বইটিতে স্পষ্ট।
তার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে অনেক উদাহরণ, গবেষণালব্ধ ও নিজের ডেভেলপ করা কিছু কৌশল (যেমন
আত্ব-অনুপ্রেরণার জন্য PREM পদ্ধতি) দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে
প্রকাশিত ইংরেজি বইয়ের ভিত্তিতে লেখা হলেও সে অর্থে লেখকের যথেষ্ট মৌলিক অবদান রয়েছে
বইটিতে। বাংলা ভাষাভাষী পাঠক বইটি পড়ে আবেগীয় বুদ্ধিমত্তার যথোপযুক্ত ব্যবহারের মাধ্যমে
পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনে সফল ও সুখী হওয়ার পূর্ণাঙ্গ একটি দিকনির্দেশনা পাবেন ।
মোঃ হোসাইন আলী
প্রভাষক
একাউন্টিং এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগ
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
Email: hossainais19@gmail.com

Comments
Post a Comment